একটি হাতিকে প্রায় দুই হাজার লোকের সামনে সরকারিভাবে ফাঁসিতে ঝোলানো হয় এবং তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। কি ছিলো তার অপরাধ? কি দোষ ছিল নিষ্পাপ হাতিটির যে তাকে ফাঁসিতে ঝুলতে হলো? জানলে অবাক হবেন.....

আমেরিকার টেনিস শহরে  ১৯১৬ সালে ১৩ সেপ্টেম্বর একটি হাতিকে প্রায় 2 হাজার লোকের সামনে সরকারিভাবে ফাঁসিতে ঝোলানো হয় এবং তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। কি ছিলো তার অপরাধ? কি দোষ ছিল নিষ্পাপ হাতিটির যে তাকে ফাঁসিতে ঝুলতে হলো? জানলে অবাক হবেন.....

পৃথিবী নামক গ্রহে সবথেকে নির্দয় প্রাণীর নাম হল মানুষ। এটা ঠিক যে বর্তমান সময়ে মানুষই মানুষের প্রাণের মায়া করে না সেখানে মানুষ কিভাবে অন্য একটি প্রাণীর জীবনের মায়া করবে। ঘটনাটি 1916 সালের আমেরিকার টেনিস নামক একটি শহরে স্পার্কস ওয়ার্ল্ড ফেমাস শো নামে বিশাল একটি সার্কাস এর আয়োজন করা হতো। সার্কাস দেখার জন্য আমেরিকার বিভিন্ন শহর থেকে হাজার হাজার মানুষ ভিড় করত। এই সার্কাস এ প্রধান আকর্ষণ ছিল মেরি নামক একটি হাতি যে ছিল সার্কাস এর  সুপারহিরো। হাতিটির ওজন ছিল প্রায় ৪৫০০ কেজি। যে তার আচার-আচরণে হাজার হাজার দর্শকের মন কেড়ে নিয়েছিল। সেই সার্কাসে বিভিন্ন ধরনের প্রাণী থাকলেও মেরি ছিল সব থেকে বিখ্যাত সবাই তাকে খুবই ভালবাসত দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসতো শুধুমাত্র এই  হাতিটির অবিশ্বাস্য ক্রিয়াকৌশল দেখতে। মেরির ও তার কেয়ার টেকার দুজনের মধ্যে খুবই ভালো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। দুজন দুজনকে খুবই ভালভাবে বুঝতে পারত। সার্কাসের মালিক সেইসময় মেরিকে দিয়ে খুব ভালো খুব ভালো পরিমাণে উপার্জনও করছিল তাই সার্কাস টিমের সকল সদস্যদের মধ্যে সবথেকে বেশি  জনপ্রিয়তা ছিল মেরির। বিভিন্ন ধরনের খাবার  এর মধ্যে সবথেকে বেশি পছন্দ করত কলা। মেরি একবারে প্রায় 40 থেকে 50 টি কলা খেয়ে ফেলতে পারতো। কিন্তু হঠাৎ করে একদিন মেরির জীবন অন্ধকার ঘনিয়ে আসে কারণ তার সব থেকে কাছের বন্ধু অর্থাৎ তার ট্রেইনার সার্কাসের মালিকের সাথে কথা কাটাকাটি করে সার্কাস থেকে  চলে যায়। আর এটাই মেরি  বুঝতে পারে তাই সে এটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিল না। আর তাই সব সময় মন খারাপ করে বসে থাকতো। সার্কাসের মালিক মেরির জন্যে  নতুন কেয়ারটেকার নিয়োগ করে। সার্কাসের মালিক জানত মেরির সাথে ভাল সম্পর্ক হতে নতুন কেয়ারটেকার এর বেশ কিছুদিন সময় লাগবে। এবং অবশ্যই একদিন মেরীর নতুন কেয়ারটেকারের সাথে ভাল সম্পর্ক গড়ে উঠেবে। আর সে আগের মতোই হয়ে যাবে। কিন্তু তারপরও সেই সার্কাসের মালিক সে সময় দিতে নারাজ ছিল সার্কাসের মানেই নতুন নিয়োগ করা কেয়ারটেকারকে বলে খুবই দ্রুত মেরির সাথে অ্যাডজাস্ট করে দর্শকের কাছে তাঁকে মনোযোগী করে তুলতে।  নতুন কেয়ারটেকার খুবই  রাগী একজন মানুষ ছিলেন সে কথায় কথায় মেরিকে ভয় দেখাতো এবং আঘাত করতো আর সে ভাবত এভাবেই হয়তো মেরি আমার কথা শুনবে। কিন্তু এর কোন টাই হয়নি।

এর কিছুদিন পরেই সার্কাসের মালিক একটি রোড শো করার পরিকল্পনা করে দর্শকরা ভাবল রোড সার্কাস আরো বেশি হয়তো আনন্দদায়ক হবে। তাই সার্কাসের সমস্ত টিকিট বিক্রি হয়ে যায় আর সার্কাসের মালিক ও খুব খুশি হয়ে যায়। সেই সাথে সার্কাসের মালিক বেশ লাভবান হয় সবকিছু ঠিকঠাক ভাবে চলছিল কিন্তু বিপত্তি বাধে মেরি এবং তার নতুন কেয়ারটেকারকে নিয়ে কারণ তাদের মধ্যে প্রচণ্ড রেষারেষি চলছিল। যদিও এটা সার্কাসের মালিক জানত কিন্তু তারপরও সে মেরির জন্য কোন রকম পদক্ষেপ নেয়নি কারণ সার্কাসের মালিক একজন লোভী ব্যক্তি ছিল। রাস্তায় হাজার হাজার মানুষের সমাগম হল। সার্কাস এর সকল সদস্য এবং প্রাণীগুলো রাস্তায় তাদের ক্রিয়াকৌশল লেখা ছিল। সার্কাস শুরু হল এবং সবাই হাততালি দিতে থাকলো। মেরি তার নিজের খেয়াল-খুশি মতো চলছিল এবং তাকে নিয়ে দর্শকেরা সবাই বেশ এক্সাইটেড ছিল। কেউ বুঝতে পারেনি কিছুক্ষণ পরেই রাস্তায় প্রাণহানি ঘটবে। মেরি রাস্তা দিয়ে ঠিকই চলছিল কিন্তু তার ব্যবহার কিছুটা অন্যরকম ছিল হঠাৎ করে রাস্তার একপাশে কলা দেখতে পায় আগেই বলেছি মেরি কলা খেতে খুবই পছন্দ করতো আর তাই সে দৌড়ে এসে কলার কাছে চলে যায় আর সার্কাস বাদ দিয়ে মেরি কলার কাছে দৌড় দেওয়ার পেছনে আরেকটি কারণ ছিল আর তা হলো নতুন নিয়োগ করা সেই কেয়ারটেকার মেরিকে সকাল থেকে কোন কিছু খেতে দেয়নি। এতে করে মেরির প্রচন্ড ক্ষুধা লাগে কিন্তু তারপরও মেরির কেয়ারটেকার কলা খাওয়া দেখে প্রচন্ড রেগে যায় আর সেই মেরিকে আবার কাজে যোগ দিতে বলে। কিন্তু সে কেয়ারটেকারের কথা কানেই তুলছিল ছিল না। কারণ সে খুবই ক্ষুধার্ত ছিল এতে করে সেই কেয়ারটেকার খুবই রেগে যায় এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে নানা রকম ভাবে আঘাত করতে থাকে।

। আঘাতের কারণে মেরির শরীর থেকে রক্ত ঝরতে শুরু করে। সেই আঘাতের  কারনে সে কাতরাচ্ছিল আর এই ঘটনাটি ঘটেছিল শত শত দর্শকের সামনে। মেরি প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে সে রেগে গিয়ে কেয়ারটেকারকে নিচে ফেলে দেয় এবং পায়ের নিচে পিষ্ট করে মেরে ফেলে। এর এই   ঘটনাটি ঘটেছিলো শতশত দর্শকের সামনে আর এটা দেখে শত শত দর্শক ভয় পেয়ে যায় এবং এলোমেলো ভাবে ছোটাছুটি করতে থাকে। আবার কিছু মানুষ মেরিকে আঘাত করতে শুরু করে।  মানুষ তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার জন্য আন্দোলন করতে শুরু করে পুরো শহরের মানুষ মেরিকে নানা রকমভাবে মারার পরিকল্পনা করতে থাকে। কেউ ভাবে তাকে কষ্ট দিয়ে মারবে কেউ পরিকল্পনা করছে তাকেই ইলেকট্রিক শক দিয়ে মারবে আর এটি নিয়ে তারা বেশ কিছুদিন ধরে পরিকল্পনা করা ছিল বেশ কিছুদিন পরেই মামলা আদালতে যায় সেখানে শহরবাসী মেরির বিরুদ্ধে তাদের  রাগ ও ক্ষোভ প্রকাশ শুরু করে বিচারক বাধ্য হয়ে মেরিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আদেশ দিয়ে দেয় ১৩ সেপ্টেম্বর ১৯১৬সালে। মানুষ তার মনুষ্যত্ব মনুষ্যত্ব বিসর্জন দিয়ে একটি অসহায় প্রাণী কে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেয় প্রথমে একটি ক্রেন নিয়ে আসা হয় আর প্রায় 2 হাজার মানুষের সামনে মেরিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয়া হয়।

মানুষ কতটা পাষান হতে পারে একটি নিষ্পাপ পশুর ওপর তা আমরা এই জলজান্ত ঘটনা থেকে বুঝতে পারি। কেউ তখন ভেবে দেখল না কেন মেরি সেদিন উন্মত্তের মতো ছুতে ছিল,কেউ আসল কারণ দেখনি সবাই শুধু দেখেছে মেরি প্রানপনে ভিড়ের মাঝে ছুটেছে আর তার কেয়ারটেকার কে আছড়ে মেরে ফেলেছে। মেরির ওই কাজ করার পেছনে কতটা কষ্ট লুকিয়ে ছিল তা কেউ ভেবে দেখেনি, আর তাঁকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেওয়া হল।