কিছু আবিষ্কার ছিল কেবল মাত্র দুর্ঘটনা।

ইংরেজিতে একটা কথা আছে "Necessity is the mother of invention", অর্থাৎ, প্রয়োজনীয়তাই আবিষ্কারের জননী। বিজ্ঞানের এই অগ্রগতিতে মানুষ অনেক জিনিস তৈরি করেছে, জুতো থেকে উড়োজাহাজ, কলম থেকে কম্পিউটার, প্রসাধনী থেকে ভ্যাকসিন সব। কিছু জিনিস খুব দরকারি, কিছু জিনিস শুধুমাত্র বিলাসিতার জন্য। সব ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তাই মূল প্রেরণা। কিন্তু কিছু আবিষ্কার কেবল মাত্র ঘটনাক্রমে হয়ে গিয়েছে, সেটাকে আপনি "দুর্ঘটনা" বলতে পারেন বা "দৈবযোগ"। এই ধরনের কিছু আবিষ্কারের ঘটনা হল --

১) মাইক্রোওয়েভ ওভেন:

বিশেষ বিশেষ সুবিধাযুক্ত এই আধুনিক যন্ত্রটির ওপর মানুষ এখন রকমারি রান্নার জন্য গভীরভাবে নির্ভরশীল। এটি অতিরিক্ত কোনো কিছু গরম না করেই সরাসরি খাদ্যবস্তু গরম করতে পারে।
১৯৪৫ সালে, এক মার্কিন স্বশিক্ষিত ইঞ্জিনিয়ার, পার্সি স্পেন্সার মাইক্রোওয়েভ নিঃসারক যন্ত্রে কাজ করার সময় খেয়াল করেন যে তার পকেটে রাখা চকলেট গলতে শুরু করেছে। তখন তিনি বুঝতে পারেন যে এটি হয়েছে মাইক্রোওয়েভ তরঙ্গের জন্য এবং তার ফল আজকের মাইক্রোওয়েভ ওভেন।

২) এক্স-রশ্মি (X - ray):

এক্স- রশ্মি দ্বারা তোলা এই ছবিটি হল উইলহেম রেন্টজেনের প্রথম "মেডিকেল" এক্স-রে, তার স্ত্রীর হাতের (আংটি সহ) মুদ্রণ, ২২শে ডিসেম্বর ১৮৯৫ সালে নেওয়া।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের বহুল ব্যাবহৃত এবং খুব প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি হলো এক্সরে। এক্সরে হলো আসলে এক প্রকার তড়িৎ চুম্বকীয় তরঙ্গ যা শরীরের মাংস পেশী ভেদ করে যেতে পারে।
১৮৯৫ সালে জার্মান পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক উইলহেম কনরাড রেন্টজেন ক্যাথোড রশ্মি নল নিয়ে গবেষণা করার সময় লক্ষ্য করেন যে কালো কার্ডবোর্ড ভেদ করে কোনো অজানা রশ্মির কারণে কিছু দূরে রাখা রাসায়ানিক প্রলেপ যুক্ত পর্দা চকচক করছে। রশ্মি শনাক্ত করতে না পারার কারণে নাম দেন এক্স - রশ্মি (X-ray)।

৩) সুপার গ্লু:

গৃহস্থালির দৈনন্দিন জিনিসের মধ্যে একটি হলো সুপার গ্লু। জিনিস পত্র জোড়া লাগানো, সারাই করা এমনকি চিকিৎসা ক্ষেত্রে রক্ত বন্ধ করতে বা কাটা জোড়া লাগানোর জন্য সুপার গ্লু ব্যাবহার করা হয়।
সুপার গ্লু বা সায়ানোঅ্যাক্রিলেট আবিষ্কার হয় ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে। ডঃ হ্যারি কুভার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় স্বচ্ছ প্লাস্টিকের গান সাইট(gun sight) তৈরির সময় দেখেন যে তার তৈরি একটি ফর্মুলা গান সাইট এর জন্য সফল হয়নি, কিন্তু তা আঠালো ধর্মী এবং খুব দ্রুত জুড়ে যেতে পারে। তখন ফর্মুলাটি বাতিল হয়ে যায়। ১৯৫১ সালে ইস্টম্যান কোডাক কম্পানিতে কাজ করা কালিন তিনি পদার্থটই আবার খুঁজে পান এবং তখন তার বাণিজ্যিক ব্যবহার এর কথা ভাবেন।

৪) টেফ্লন:

উচ্চ তাপ সহনশীল এই পলিমারটি বিমান বা কম্পিউটারের তার এ, ফ্রাইং প্যানে এ ব্যাবহৃত হয়। ফ্রাইং প্যানের ভেতর পাশে কালো রঙের যে অস্টরণটি থাকে তা হলো টেফ্লনের তৈরি।
১৯৩৮ সালে রসায়নবিদ রয় প্লাঙ্কেট নতুন ধরনের প্রশীতক ক্লোরো ফ্লুরো কার্বন তৈরি করার চেষ্টা করছিলেন কিন্তু কোনো ভাবে অদ্ভুত একটি রাসায়নিক তৈরি করে ফেলেন যা কিছুটা সাদা ময়দা বা পাউডার এর মত দেখতে। পরীক্ষা করে তিনি জানতে পারেন এটি একটি উচ্চ গলনাঙ্কো বিশিষ্ট পিচ্ছিলকারক পদার্থ।

৫) পেনিসিলিন:

চিকিৎসা বিজ্ঞানে বহুল ব্যাবহৃত আন্টি ব্যাকটেরিয়াল ড্রাগ হলো পেনিসিলিন।
১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে স্যার আলেকজান্ডার ফ্লেমিং পেনিসিলিন আবিষ্কার করেন। Staphylococcus aureus ব্যাকটেরিয়া নিয়ে কাজ করা কালীন ২ সপ্তাহের ছুটি থেকে ফিরে লক্ষ্য করেন যে খোলা জানালার কাছে রাখা তার ব্যাক্টেরিয়ার পেট্রি ডিশ এ ছত্রাক লেগেছে। তা পরীক্ষা করে দেখেন যে ওই ছত্রাক ব্যাক্টেরিয়ার বৃদ্ধি আটকে দিয়েছে। এই ছত্রাক আসলে পেনিসিলিয়াম নোটেটাম, এর থেকে তিনি পেনিসিলিন তৈরি করেন।

৬) ভেলক্রো:

ব্যাগ, জুতো, হাত ঘড়ি ইত্যাদি তে ব্যাবহৃত এই সাধারণ জিনিসটি নিয়ে আমরা অনেকেই কখনো ভেবে দেখিনি। কিন্তু এটা আমাদের অনেক দৈনন্দিন জিনিস কে সহজ করে দিয়েছে, বাঁচিয়েছে অনেক সময়।
জর্জ ডি মেস্ট্রাল যখন তার কুকুরের সাথে স্বীকারে গিয়েছিলেন, তখন দেখেন যে তার কুকুরের লোমে আগড়া ফল (কাঁটা যুক্ত ছোট ফল বিশেষ) আটকে আছে। টা দেখে তিনি ফলটি অণুবীক্ষণ যন্ত্রে দেখেন যে তাতে ছোট ছোট হুক আছে যা সহজেই তন্তুর সাথে আটকে যায়। এর পর কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন রকম কাপড়ের সাথে পরীক্ষা করে ভেলক্রো তৈরি করেন।