জেনে নিন এই বছর কার্তিক মাসে দুর্গা পুজা হওয়ার প্রকৃত কারন

নীল আকাশ আর সেই আকাশে ভেসে বেড়ানো সাদা ফেনার মত মেঘ এই বিশ্বব্যাপী মহামারীর মধ্যেও আমাদের মনের মধ্যে যেন আশার আলো জাগায়। প্রকৃতি যেন সেজে উঠছে সেই শুভ শক্তিকে আবাহন করার জন্য যা আমাদের জীবনীশক্তিতে নতুন উদ্যমের সঞ্চার করবে। মৃদুমন্দ বাতাসে কাশ ফুলের দোলন বার্তা দিচ্ছে সকল আঁধার কাটিয়ে মা আসছেন নতুন সকালের সূচনা করতে। এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও বাঙালী মাকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু এই বছর যেন সবকিছুতেই এক ব্যাতিক্রমী ছাপ রেখে যেতে চায়। বাঙালীর প্রাণের উৎসব দুর্গা পুজাতেও এবছর লক্ষ্য করা যাবে ভিন্নতা। আমরা সবাই জানি এই বছর মহালয়া থেকে পুজারম্ভের মধ্যে প্রায় ৩৫ দিনের পার্থক্য যা সাধারণত সাত দিনের হয়ে থাকে। আবার গ্রহ নক্ষত্রের ফেরে মহালয়া আর বিশ্বকর্মা পুজাও হবে একিই দিনে। অনেকেই এই ঘটনার সাথে অতিমারীর প্রসঙ্গকে টেনে এনে কোনও কল্পিত গল্পের অবতারণা করতেই পারেন। কিন্তু এসবের পেছনে রয়েছে জ্যোতিষ গণনা সংক্রান্ত সাধারন কিছু নিয়ম। 

সাধারণত আশ্বিন মাসেই দুর্গা পুজার শুভারম্ভ হয়ে যায় মহালয়ার এক সপ্তাহ পরেই। কিন্তু এই বছর মহালয়া থেকে ৩৫ দিন পেরিয়ে দুর্গা পুজা পৌঁছে গেছে কার্ত্তিক মাসে। কিন্তু এই ঘটনা ঘটার কারন কি? পঞ্জিকা মতে এই বছরের আশ্বিন মাস ‘মলমাস’ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। জ্যোতিষ শাস্ত্র অনুযায়ী মল মাসে কোনো শুভ কাজের বা অনুষ্ঠানের তিথি নির্ধারিত হয় না। তাই এই মাসকে ‘মলিন মাস’ বা সাধারন কথায় ‘মলমাস’ বলা হয়। সাধারণ ভাবে সূর্য একই রাশিতে থাকা কালীন যদি সেই মাসে দুটি অমবস্যা দেখা যায় তবে তাকে মলমাস বলা হয়। এবছর ১৭ই সেপ্টেম্বর বা ৩১শে ভাদ্রতে অমাবস্যার দিন মহালয়া। এই মাসেই ২ তারিখও অমাবস্যা ছিল। তাই নিয়ম অনুযায়ী পরের দিন থেকে সূর্য কন্যা রাশিতে প্রবেশ করছে এবং পিতৃপক্ষের অবসান হয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু জ্যোতিষ নিয়ম অনুযায়ী তা মল মাসের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাচ্ছে। তাই গ্রহের ফেরে এবছর ১৭ই অক্টোবর থেকে দেবীপক্ষের সূচনা হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে এই মলমাসের পেছনে রয়েছে একটি গানিতিক হিসাব, যা কিছুটা ‘অধিবর্ষের’ সাথে তুলনীয়। 

ভারতীয় জ্যোতিষ নিয়মে বছরের হিসেব করা হয় চান্দ্র মাস এবং সৌর মাসের মাধ্যমে। চান্দ্র মাসকে ভিত্তি করে বছরের হিসেব করলে প্রতি বছর প্রায় ১১ দিন করে অতিরিক্ত রয়ে যায়। তাই সৌর বর্ষের সাথে তার সামঞ্জস্য রাখার জন্য দুই বা তিন বছরের মধ্যে একটি অধিক মাস যোগ করা হয়। ওই মাসে যেহেতু কোনও তিথি নির্ধারিত থাকে না তাই ওই মাসে পঞ্জিকা মতে সমস্ত রকম ক্রিয়াকলাপ নিষিদ্ধ করা হয়। এই চান্দ্র মাসে সূর্য এক রাশি থেকে অন্য রাশিতে গমন না করে একই রাশিতে অবস্থান করে থাকে। এই রকম ক্ষেত্রে পরের মাসটিকে আগের মাসের অধিক মাস বা মলমাস হিসেবে বর্ণনা করা হয়ে থাকে। তবে এই ঘটনা যে খুবই দুরলভ এমনটা কিন্তু নয়। দেখা গেছে প্রতি ১৯ বছর ছাড়া ছাড়া আশ্বিন মাসটি মলমাস হয়। এই হিসেবে ২০০১ সালেও দুর্গা পুজা হয়েছিল কার্ত্তিক মাসে। তার আগে ১৯৮২ সালেও এমন ঘটনা ঘটেছিল এবং হিসেব অনুযায়ী আগামী ২০৩৯ সালেও এই ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থেকে যায়। 

এছাড়াও একই দিনে মহালয়া এবং বিশ্বকর্মা পুজার তিথি পড়ায় অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে। জ্যোতিষবিদ এবং পঞ্জিকা রচয়িতাদের মতে এটি খুবই সাধারণ ব্যাপার, যদিও এমন ঘটনা বেশ কয়েক দশক পর দেখা যাচ্ছে। মহালয়া প্রতিবছরই অমাবস্যাতেই হতে দেখা যায়। পঞ্জিকা মতে ১৭ই সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যে ০৫ঃ০৪ পর্যন্ত অমাবস্যা। আবার ওই দিনেই সকাল ১০টা বেজে ৩০ মিনিটের পর সূর্য কন্যা রাশিতে প্রবেশ করবে। নিয়ম অনুযায়ী সূর্য কন্যা রাশিতে প্রবেশ করলে সংক্রান্তিতে বিশ্বকর্মা পুজার তিথি পড়ে। তাই এক্ষেত্রে দুই তিথি একই দিনে পড়ে যাওয়ায় মহালয়া আর বিশ্বকর্মা পুজা একই দিনে সংঘটিত হচ্ছে।