প্রাণী জগতের জন্য কতটা বিপজ্জনক এই 5G?

 

   ২০১৯ এর প্রথম দিকে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে পরীক্ষামূলক ভাবে 5G পরিষেবা চালু করা হয়। তার সঙ্গে চালু হয় বিভিন্ন ভয়ের তত্ত্ব। নতুন প্রযুক্তিতে আতঙ্ক এই প্রথম নয়, ইতিহাসে অনেক নজির আছে যেখানে নতুন কিছু মেনে নিতে মানুষের খুব অসুবিধে হয়েছে আবার অনেক ক্ষেত্রে আতঙ্কের স্রোত বয়ে গেছে। 5G এর ক্ষেত্রেও আতঙ্কের সঞ্চার হয়েছে এবং তা ইন্টারনেটের দৌলতে ছড়িয়েছে পৃথিবীর কোনায় কোনায়।

    অষ্টাদশ শতকের শেষদিকে রাস্তায় বৈদ্যুতিক বাতির ব্যবহার শুরু হয়। যদিও অনেক শহরে গ্যাসের বাতি ছিল কিন্তু তা ছিল ব্যয়বহুল। শহরের অল্প অংশ আলোকিত করতে পারা গ্যাসের বাতি গুলি কিন্তু সত্যিকার বিপদের কারণ হতে পারত, বিস্ফোরণের মাধ্যমে। অন্যদিকে বৈদ্যুতিক বাতি ছিল সস্তা, একটা সুইচ টিপে অন্ অফ্ করা যেত, গ্যাসের বাতির মত একজন অনেক সময় ধরে জ্বালাতে থাকতো না। নতুন এই বৈদ্যুতিক বাতির দ্বারা গোটা শহরকে আলোকিত রাখা সম্ভব ছিল যার ফলে নিরাপত্তা বাড়ে। কিন্তু অনেকেই সত্যিকার ভয় পেয়েছিল যে প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে যাওয়া হচ্ছে, কে জানে হয়ত অনেক কিছু পাল্টে যাবে। দিন রাত্রির পার্থক্য কমে যাওয়ার জন্য নিদ্রা চক্র(sleep cycle) উলোট পালোট হয়ে গিয়ে মানুষ ঠিকঠাক সময় ঘুমোতে পারবে না। কেজানে হতো শয়তান নেমে আসবে পৃথিবীর বুকে, নদী উল্টো দিকে ছুটবে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু তেমন কিছুই ঘটেনি।

    5G আসার সঙ্গে সঙ্গেই বিভিন্ন বিকৃত তত্ত্ব ছড়াচ্ছে 5G গতিতেই। 5G মস্তিষ্ক সেদ্ধ করে দেবে, 5G ক্যান্সার এর কারণ ইত্যাদি। 5G কি সত্যি প্রাণী জগতের জন্য খুব ক্ষতিকারক? 5G কি সত্যি আমাদের মস্তিষ্ক সেদ্ধ করে দিতে পারে বা 5G এর রেডিয়েশন কি আমাদের ক্যান্সার করতে পারে?


    কি এই 5G?
    5G এর অর্থ 5th Generation, যার বাংলা হল পঞ্চম প্রজন্ম। এটি 4G এর তুলনায় অনেক বেশি গতিতে তথ্য আদানপ্রদান করতে পারে, যা ১০ গিগাবিট পর্যন্ত তথ্য প্রতি সেকেন্ডে আদান প্রদান করতে পারে। যার অর্থ হলো একটি HD মুভি ডাউনলোড করতে ২ সেকেন্ডে সময় লাগবে। 5G হলো উচ্চ কম্পাঙ্ক ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশন। এর উচ্চ কম্পাঙ্ক বেশি দ্রুত গতিতে তথ্য আদান প্রদান করতে সাহায্য করে। কিন্তু সমস্যার বিষয় হল তরঙ্গদৈর্ঘ্য কমার সঙ্গে সঙ্গে কমে যায় এর প্রসার। দেওয়াল ভেদ করার ক্ষমতাও কমে যায় অনেক খানি। ফলে বানিজ্যিক ভাবে 5G শুরু করতে গেলে সেল টাওয়ার গুলি অনেক কাছাকাছি থাকা দরকার, এবং অনেক বেশি সংখ্যায়। একটু দূরে গেলেই 5G আর চলবে না।

    "রেডিয়েশন" শুনলেই আমাদের ভয় লাগে। নিউ জিল্যান্ডের এক মহিলা অনলাইন পিটিশন জমা দেন যাতে সরকার 5G র ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তিনি facebook এ কোথাও 5G এর ক্ষতিকারক দিক সমন্ধে পড়েছিলেন। আমরা জানি ফেসবুক হলো বিশ্ববিখ্যাত, বিশ্বস্ত সংস্থা সমস্থ বৈজ্ঞানিক বিষয়ের তথ্যের জন্য। তাই তিনি পড়া মাত্রই পিটিশন জমা দেন। ওই মহিলা একা নন, বেলজিয়ামের সরকার অ্যান্টি-রেডিয়েশন আইন পাশ করে। আইনটি কার্যকরী করায় আমাদের শুভ কামনা রইলো, কারণ এই ইলেকট্রো ম্যাগনেটিক রেডিয়েশন কিসে নেই? পুরনো AM রেডিও, FM রেডিও, 2G, 3G,4G এমনকি, রোদ্দুর, বাল্বের আলো সবই।

   রেডিয়েশন বুঝতে হলে জানতে হবে রেডিয়েশন দু প্রকার - আয়নাইজিং রেডিয়েশন বা তেজস্ক্রিয় বিকিরন ও নন আয়নাইজিং রেডিয়েশন অ-তেজস্ক্রিয় বিকিরন।

আয়নাইজিং রেডিয়েশন প্রকৃতপক্ষে ক্ষতিকারক। এই ধরনের রেডিয়েশন ইলেকট্রন এর বিচ্যুতি ঘটাতে পারে এবং এর অনুকে ভেঙ্গে ফেলার ক্ষমতা আছে। শরীরে প্রবেশ করলে শরীরের মধ্যকার DNA ভেঙ্গে ফেলতে পারে। এই ধরনের রেডিয়েশন ক্যান্সার সৃষ্টি করে। অতিবেগুনি রশ্মি, এক্স রশ্মি, গামা রশ্মি এই ধরনের রেডিয়েশন। অন্য দিকে বেতার তরঙ্গ, WiFi, 4G, 5G বা দৃশ্যমান আলোক হল নন আয়নাইজিং রেডিয়েশন।  এদের অনুকে ভাঙ্গার ক্ষমতা নেই, তবে এরা তাপ উৎপন্ন করতে পারে।
     5G হলো মাইক্রোওয়েভ রেডিয়েশন, যা মাইক্রোওয়েভ ওভেন এ ব্যবহার হয়। মাইক্রোওয়েভ রেডিয়েশন শরীরের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হলে তাপ উৎপন্ন হয়। তবে একটি মোবাইল ফোনের 5G সিগন্যাল মাইক্রোওয়েভ ওভেনের তুলনায় কয়েকশ গুন কম শক্তি সম্পন্ন মাইক্রোওয়েভ তৈরি করতে পারে। তাই 5G সিগন্যাল পারে না মাইক্রোওয়েভ ওভেনের মত শক্তি তৈরি করতে। তাই মোবাইল এর সিগন্যাল কখনই মাইক্রোওয়েভ ওভেনের মত তাপ তৈরি করতে পারবে না।  
    বাণিজ্য করার উদ্দেশেই বলা হয় যে মোবাইল এর রেডিয়েশন শরীরে অনেক ক্ষতি করে। আর এই কথা বলে ওই রেডিয়েশন থেকে শরীরকে রক্ষা করার জন্য যে সব জিনিস আপনাকে বিক্রি করবে তা হয়তো আদৌ রেডিয়েশন থেকে আপনার শরীর রক্ষা করবে না।


    অষ্টাদশ শতকের মানুষের কথায় হাসি পাচ্ছে। তাই না? সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু হতে পারে ৫০ বছর পরে আমাদের ওপরও আমাদের পরের প্রজন্ম হাসাহাসি করবে 5G এর ওপর ভয়ের জন্য।