গান শুনিয়ে পণ্ডিত যশরাজ পেয়েছিলেন ৫০০০ মোহর!

দীর্ঘ ৭০ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রবাহিত হওয়া এক স্বর্গীয় সুর-ঝর্ণার পরিসমাপ্তি ঘটল ৯০ বছর বয়সী পণ্ডিত যশরাজের মহাপ্রয়াণের মধ্যে দিয়ে। সোমবার, ১৭ই আগস্ট,  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সি শহরে তাঁর অসংখ্য গুণমুগ্ধ শ্রোতা অনুরাগীদের হৃদয় ভারাক্রান্ত করে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। সংগীত প্রেমীদের মত অনুযায়ী শাস্ত্রীয় সংগীতের এক যুগের পরিসমাপ্তি ঘটল তাঁর প্রয়াণের মধ্যে দিয়ে। মেওয়াতি ঘরানাকে বিশ্বের দরবারে প্রকৃত রূপে প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত গায়ন শৈলীর মধ্যেও তিনি আধুনিক এবং যুগোপযোগী অনেক পরিবর্তন এনেছিলেন। সুর-জগতের এই মহান মানুষটির হৃদয় ছিল উদার এবং শিশুর মত। আবার তাঁর ব্যাক্তিত্ত্ব জুড়ে ছিল এক নিদারুন নিয়মানুবর্তিতা এবং শৃঙ্খলাপরায়ণতা। ওনার জীবনও ছিল বর্ণময় এবং ঘটনাবহুল। পাঠকবন্ধুরা, আসুন আজ আমরা জেনে নিই পণ্ডিতজী-র জীবনের অনেক জানা-অজানা চমকপ্রদ তথ্য। 



১। তবলা বাদক থেকে গায়কঃ 

পণ্ডিত যশরাজ ১৯৩০ সালের ২৮শে জানুয়ারি হরিয়ানার হিসার জেলায় এক মধ্যবিত্ত ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। বাবা পণ্ডিত মতিরাম নিজেও ছিলেন একজন শাস্ত্রীয় সংগীত শিল্পী। মাত্র চার বছর বয়সেই বাবাকে হারান ছোট্ট যশরাজ। ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি তবলা শিল্পী হিসেবে গায়কদের সঙ্গত করতেন। পণ্ডিতজী-র কথা অনুযায়ী তবলা বাদক হিসেবে তিনি যথেষ্ট ভালই ছিলেন। তবলার সঙ্গত ভালই চলছিল, কিন্তু ১৯৪৫ সালের এক ঘটনা মোড় ঘুরিয়ে দিল। ওই বছর লাহোরে কুমার গন্ধর্বের সাথে এক মঞ্চে তবলায় সঙ্গত করছিলেন পণ্ডিতজী। অনুষ্ঠানে কুমার গন্ধর্ব যশরাজকে “চামড়া পেটানো” সামান্য বাজনদার বলে অপমান করেন এবং তিনি যশরাজের রাগ বিষয়ে কতটুকু ধারনা আছে সে নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। যশরাজ তখনই কণ্ঠ সংগীত শেখার জন্য মনস্থির করে ফেলেন এবং গুজরাটে যাতায়াত শুরু করেন মেওয়াতি ঘরানার সংগীত শিক্ষা লাভের জন্য।

২। স্কুল ফাঁকি দিয়ে বেগম আখতারঃ

‘এশিয়ান এজ’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পণ্ডিতজী জানিয়েছিলেন তিনি বাল্যকালে মাঝে মাঝেই বিদ্যালয় কামাই করে রাস্তার ধারে এক রেস্তোরাঁর সামনে বসে থাকতেন। ওই রেস্তোরাঁতে প্রায়ই বেগম আখতারের গান বাজত। আর বেগম আখতার তাঁর এতই প্রিয় ছিল যে তিনি ওই গান বার বার শোনার জন্যই বিদ্যালয় ফাঁকি দিতেন।

৩। রেডিও শিল্পী হিসেবে কলকাতায়ঃ 

১৯৪৬ সাল নাগাদ তিনি কলকাতায় চলে আসেন এবং কণ্ঠ শিল্পী হিসেবে প্রথম রেডিওতে গাওয়া শুরু করেন। এই সময় বেশ কয়েক বছর তিনি শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবার জন্য চেষ্টা করতে থাকেন। কলকাতায় তিনি পাকাপাকি ভাবে থাকতে শুরু করেন এবং ১৯৬২ সাল পর্যন্ত কলকাতায় থাকার পর ১৯৬৩ সালে বোম্বাইতে চলে আসেন। 

৪। উপহার হিসেবে ৫০০০ স্বর্ণ মুদ্রা লাভঃ

 

যশরাজ কণ্ঠ শিল্পী হিসেবে তাঁর প্রথম মঞ্চ পরিবেশন করেন ১৯৫২ সালে নেপালের রাজা ত্রিভুবন বীর বিক্রম শাহের দরবারে। এটাই ছিল গায়ক হিসেবে তাঁর প্রথম ‘পাবলিক কনসার্ট’। কিন্তু তিনি তাঁর প্রথম সংগীত পরিবেশনের পর আশ্চর্য হয়ে যান যখন রাজা ত্রিভুবন তাঁকে উপহার স্বরূপ ৫০০০ স্বর্ণ মুদ্রা দানের ঘোষণা করলেন। হিন্দুস্থান টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন ২২ বছর বয়সে এত বড় উপহারের ঘোষণায় তিনি স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন এতগুলি মুদ্রা তো তিনি একা গুনতেও পারবেন না।

৫। সাত মহাদেশে সংগীত পরিবেশনঃ

২০১২ সালের ৮ই জানুয়ারি  তিনি এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেন। ৮২ বছর বয়সে ‘সি স্পিরিট’ নামে এক স্ক্রজ জলযানের ওপর অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশে সংগীত পরিবেশন করেন। আর এর সাথেই প্রথম ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত শিল্পী হিসেবে সাতটি মহাদেশেই গান গাওয়ার অনন্য কৃতিত্ব অর্জন করেন। এর আগে ২০১০ সালে তাঁর স্ত্রীর সাথে উত্তর মেরুতেও গান গেয়ে এসেছিলেন।

৬। হাভেলি সংগীত এবং খেয়ালঃ

‘হাভেলি সংগীত’ হল এক বিশেষ ধরণের ভক্তি সংগীত যা মন্দিরে পরিবেশিত হত গভবান কৃষ্ণের গুনগান তুলে ধরার জন্য। যশরাজ এই হাভেলি সংগীতে খেয়ালের মেজাজ আরোপ করেন। এছাড়াও ভক্তি ও রাগের ভাব মিলিয়ে শৌখিন হরকৎ ও মুড়কি আরোপ করে ‘ভক্তি রসের’ সৃষ্টি করেন। তাঁর এই সেমি-ক্লাসিক্যাল ভক্তি সংগীত সাধারন শ্রোতার মধ্যে জনপ্রিয়তা লাভ করে। 

৭। যশরঙ্গি যুগলবন্দীঃ 

তিনি চিরকালই নতুনত্ব এবং আধুনিকতায় বিশ্বাসী ছিলেন। শাস্ত্রীয় সংগীত ছাড়াও তিনি সব ধরণের গান শুনতে পছন্দ করতেন। এমনকি পাশ্চাত্য সংগীতেও তাঁর অনুরাগ ছিল। তিনি এক নতুন ধরণের যুগলবন্দীর প্রচলন করেন যার নাম হয় ‘যশরঙ্গি’; যেখানে একজন পুরুষ এবং একজন মহিলা শিল্পী তাঁদের নিজ নিজ স্কেলে ভিন্ন ভিন্ন রাগ গাইবেন। ভিন্ন রাগ গাইলেও তারই মধ্যে তাঁরা পরস্পরকে সঙ্গত দেওয়ার চেষ্টা করবেন এবং ভিন্নতার মধ্যেও একটি সুন্দর সুরের ঐক্য তুলে ধরবেন।

৮। গ্রহের নামাঙ্কন ও পদ্ম সম্মানঃ 

যশরাজ সারা জীবন জুড়ে অনেক সম্মান লাভ করেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল তিনটি পদ্ম সম্মান এবং সংগীত নাটক অ্যাকাডেমি পুরস্কার। এছাড়াও সম্প্রতি ইন্টার ন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়ন একটি গ্রহানুর নামকরন করেছেন “Panditjasraj” যার পূর্ব নাম ছিল 2006, VP32(Number 300128)। দেশের পূর্ব প্রধানমন্ত্রী শ্রী অটল বিহারী বাজপায়ী তাঁকে ‘রসরাজ’ উপাধিও দান করেছিলেন।

৯। লাইফ অফ পাইঃ 

বেশ কয়েকটি  চলচিত্রেও তিনি গান গেয়েছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ১৯৭৩ সালের ‘বিরবল মাই ব্রাদার’ সিনেমাতে পণ্ডিত ভিমসেন যোশীর সাথে যুগলবন্দী এবং অস্কার জয়ী সিনেমা ‘লাইফ অফ পাই’ তে গান গাওয়া। এছাড়া তিনি স্বাধিনতার ৫০ ও ৬০ বছর পূর্তিতে পার্লামেন্টেও গান গেয়েছেন।

১০। হরিণ-মনমোহিনীঃ

এ যেন এক সুরের চমৎকার। সময়টা ছিল ১৯৮৭ সালের এপ্রিল মাস। পণ্ডিতজী বেনারসের সঙ্কটমোচন হনুমান মন্দিরে তুলসি দাসের লেখা কবিতা তোড়ী রাগের মাধ্যমে পরিবেশন করছিলেন। পণ্ডিতজী রাগের মধ্যে বিভোর হয়ে চোখ বুজেছিলেন। এমন সময় কোথা থেকে এক হরিণ মন্ত্র মুগ্ধের মত মঞ্চের দিকে এগিয়ে জেতে লাগল এবং যশরাজজীর দিকে তাকিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। এমন মনে হচ্ছিল যেন মঞ্চ থেকে ভেসে আসা সুর তাকে আকর্ষণ করছে। এরপর পণ্ডিতজী চোখ খুলতেই হরিণটি কোথায় যেন পালিয়ে যায়।