মাত্র দশ বছর বয়সেই করেছিলেন গান রেকর্ড! এমনই প্রতিভা ছিল ভূপেন হাজারিকার!

ভারতীয় সংগীত জগতে এক প্রবাদপ্রতিম ব্যাক্তিত্ব ছিলেন ডক্টর ভূপেন হাজারিকা। গায়ক হিসেবে তিনি ছিলেন দরাজ কণ্ঠের অধিকারী। তাঁর গানের মধ্যে বারবারই উঠে এসেছে বাস্তবিক সমাজ চেতনা এবং প্রতিবাদের কথা। তাঁর গানের মাধ্যমে সমাজের নিপীড়িত, শোষিত, অবহেলিত এবং পিছিয়ে পড়া মানুষের করুণ ছবি ফুটে উঠেছে বারবার। তাঁর ভালবাসা তিনি বিলিয়ে দিতে ছেয়েছিলেন দেশের এই সব মানুষের মধ্যে। তাই শুধু আসাম নয়, সারা দেশের কাছেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন ‘সুধাকণ্ঠ’। ভারতীয় সংস্কৃতি জগতে এক বিশেষ ধারার প্রচলন করেছিলেন এই বহুমুখী প্রতিভাধর মানুষটি। তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় ছিল বর্ণময় এবং ঘটনাবহুল। আজ তাঁর ৯৪তম জন্মদিবসে আমরা আরও একবার চোখ বুলিয়ে নেব সেই সব অসাধারন কিছু জানা অজানা তথ্যের ওপর।

ভূপেন হাজারিকা ছিলেন বাবা মায়ের দশ সন্তানের মধ্যে সব থেকে বড়। যখন তাঁর বয়স মাত্র দশ বছর, তখনই তাঁর প্রতিভার নিদর্শন প্রকাশ হতে শুরু করে। আসামের বিখ্যাত চলচিত্রকার এবং কবি জ্যোতিপ্রসাদ আগারয়াওালার নজরে পড়ে যান ছোট্ট ভূপেন। ১৯৩৬ সালে মাত্র দশ বছর বয়সেই কলকাতার এক স্টুডিওতে রেকর্ড করে ফেললেন তাঁর প্রথম গান। পরে, ১৯৩৯ সালে‌  আগারয়াওালারই ‘ইন্দ্রমালতি’ সিনেমাতে গাইলেন দুটি গান। যদিও তখনও প্লে-ব্যাক প্রথার প্রচলন ঘটেনি। মাত্র তের বছর বয়সেই তিনি লিখে ফেললেন তাঁর প্রথম গান ‘অগ্নিজুগোর ফিরিঙ্গতি মই’ এবং এর সাথে সাথেই সূচনা করে ফেললেন গীতিকার, সুরকার এবং গায়ক হিসেবে এক দীর্ঘ যাত্রা পথের। 



১৯৪৪ সালে তিনি বি.এ পাস করেন বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি থেকে এবং ১৯৪৬ সালে এম.এ পাসও করেন ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই। বেনারসে পড়াশোনার সময় তিনি শাস্ত্রীয় সংগীতে অনুরক্ত হয়ে পড়েন। শাস্ত্রীয় সংগীতের রেওয়াজ কেমন করে করা হয় তা শোনার জন্য তিনি বিসমিল্লা খানের বাড়ীর সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতেন। পরবর্তী কালে তিনি শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রথাগত তালিমও নিয়েছিলেন।

১৯৪৯ সালে হটাতই তিনি কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সুযোগ পেয়ে যান। পড়াশোনার জন্য স্কলারশিপও পান। কিন্তু ওই টাকায় সমস্ত খরচ চালানো তাঁর পক্ষে মুশকিল ছিল। তাই তিনি লিফট ম্যানের পার্টটাইম কাজ নিলেন। নিউইয়র্কের ১১৪নং স্ট্রিটে তিনি থাকতেন। আর ১২৫ নং-এ থাকতেন বিখ্যাত প্রতিবাদী শিল্পী পল রোবসন। দুজনের মধ্যে আলাপ হল এবং তা বন্ধুত্বে রূপান্তরিত হল। এখানেই তিনি পরিচিত হলেন প্রতিবাদী সংগীতের সঙ্গে। এই প্রটেস্ট মিউজিক তাঁর সংগীত মনস্কতা এবং জীবন আদর্শের ওপর প্রভাব বিস্তার করল। এর ফল স্বরূপ দেশে ফিরে এসে তিনি সৃষ্টি করলেন কালজয়ী সব প্রতিবাদী গান। রোবসনের একটি গান ‘Old Man River’ তাঁকে এতটাই নাড়া দিয়েছিল যে দেশে ফিরে তিনি এই গানের অনুকরণে একটি গান কম্পোজ করলেন এবং গাইলেন অসমিয়া ভাষায়। গানটির নাম ছিল ‘বিস্তীর্ণ পারোরে’ । গানটি এতই জনপ্রিয়তা পায় যে পরে বাংলা এবং হিন্দিতেও গানটি রেকর্ড করা করা হয়। বাংলাতে গানটি লেখেন শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এবং গানটি ছিল ‘বিস্তীর্ণ দুপারের অসংখ্য মানুষের’। 



প্রথমে পড়াশোনার জন্য বিদেশে গেলেও পরবর্তীকালে গানের জন্য এবং বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সাথে পরিচিত হওয়ার জন্য দেশে বিদেশে ছুটে বেড়িয়েছেন এই ‘যাযাবর’ গায়ক। বিভিন্ন দেশে ঘুরে ঘুরে শুনেছেন অনেক লোকগীতি এবং শিখেছেন তাঁদের যন্ত্রানুসঙ্গের ব্যবহার। সেই সব সুরের অনুকরণে কম্পোজ করেছেন অনেক গান। উল্লেখযোগ্য ভাবে বলা যায় তাঁর গাওয়া বিখ্যাত ‘মানুষ মানুষের জন্য’ গানটি উত্তর ক্যারোলিনা প্রদেশের বিখ্যাত লোকগীতি ‘Tom Dooley’ থেকে অনুপ্রানিত হয়ে কম্পোজ করেছিলেন। 

গানের পাশাপাশি ভূপেন হাজারিকা চলচিত্র শিল্পের প্রতিও আগ্রহী ছিলেন। অসমে প্রথম সিনেমা স্টুডিয়ো গড়ে তোলার আপ্রান চেষ্টায় তিনি নির্দল প্রার্থী হিসেবে ভোটে জিতে অসম বিধানসভায় প্রবেশ করেন এবং তাঁর হাত ধরেই গড়ে ওঠে অসমের প্রথম সিনেমা স্টুডিয়ো। গানে সুর দানের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি সিনেমা পরিচালনাও করেছেন তিনি। তাঁর পরিচালিত ‘শকুন্তলা’ সিনেমাটি জাতীয় পুরস্কার লাভ করেছিল। ‘চামেলী মেমসাহেব’ সিনেমার জন্য সেরা সুরকারের জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন তিনি। কল্পনা লাজমির পরিচালনায় 'রুদালি' সিনেমাতে সুর দানের জন্যও তিনি জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন। গানগুলি আজও ভীষণ ভাবে জনপ্রিয়। গানগুলিতে বিভিন্ন রাগের ব্যবহার করে তাঁর শাস্ত্রীয় সংগীতে দক্ষতাও তিনি প্রমাণ করে দিয়েছিলেন। 



ভারতবর্ষের বাইরে বাংলাদেশেও তাঁর অতুলনীয় জনপ্রিয়তা ছিল। একবার বাংলাদেশে সমীক্ষায় বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের পরে সব থেকে বেশি মানুষ যে গানটি পছন্দ করেছিল তা হল ‘মানুষ মানুষের জন্য’ গানটি। বাংলাদেশের মুক্তি যুদ্ধের জন্য তিনি গেয়েছিলেন 'জয় জয় নবজাত বাংলাদেশ' এবং 'গঙ্গা আমার মা পদ্মা আমার মা' । এমনকি পাকিস্তানেও তাঁর গানের অনেক শ্রোতা আছে। বিদেশে গিয়ে তিনি একবার দেখেন কিছু কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ তাঁর ‘হে দোলা হে দোলা’ গানটি গাইছে, যেখানে শুধু কথা গুলো পরিবর্তিত হয়ে ‘Oh Dollar’ হয়ে গেছে। 

তাঁর গান মানেই এক উত্তরপূর্বীয় মিষ্টি পাহাড়ী সুরের মাধুর্য। কিন্তু এই পাহাড়িয়া লোকগীতির ছাড়াও তিনি গান নিয়ে অনেক গবেষণা বা পরীক্ষা নিরীক্ষা করার চেষ্টা করে গেছেন। যেমন গণসংগীতে লোকগানের প্রভাব এবং হারমোনাইজেশানের ব্যবহার। তাঁর গানের দৃষ্টিকোণ ছিল সব সময়ই শ্রমজীবী খেটে খাওয়া মানুষের সমস্যা নিয়ে। এই ভারতরত্ন জয়ী সুরের জাদুকর কখনও বলেছেন ভলগা-মিসিসিপির কথা, তো কখনও বলেছেন গঙ্গা-পদ্মা-ব্রহ্মপুত্রের কথা। তাঁর গানে যেমন উঠে এসেছে 'গৃহহীন নরনারীর' কথা তেমনই প্রকাশ পেয়েছে দোলা বহনকারীদের দুর্দশা। আবার কখনও 'হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ আর চেতনায় নজরুলকে' নিয়ে সব ভুলে গিয়ে ছুটে আসতে বলেছেন  জীবনের খোঁজে।